প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজীপুরে বুধবার সকাল থেকে তীব্র বিক্ষোভের কারণে ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের ট্রেন চলাচল ও মহাসড়ক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডে (নেসকো) প্রকৌশলী হেনস্তা ও অধিকার সুরক্ষার দাবিতে রেললাইন অবরোধসহ মহাসড়ক বন্ধ রাখার কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এ ঘটনা দেশের রাজধানী ও পাশ্ববর্তী জেলা এলাকার রেল চলাচল ও সড়ক পরিবহনকে প্রভাবিত করেছে।
বুধবার সকাল ১০টা থেকে গাজীপুরে শুরু হওয়া এই অবরোধ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা শিমুলতলী সড়ক থেকে মিছিল শুরু করে ভুরুলিয়া এলাকায় এসে রেলপথ অবরোধ করেন। এতে ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো দু’ঘণ্টা স্থগিত থাকে। জয়দেবপুর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নাজিরুজ্জামান জানান, অবরোধের কারণে বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। চিত্রা এক্সপ্রেস নামে একটি ট্রেনও মৌচাক স্টেশনে আটকা পড়ে।
ডিপ্লোমা প্রকৌশলী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা জানান, দেশের ৪০ লক্ষাধিক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ও প্রায় ৪ লাখ পলিটেকনিক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তারা অভিযোগ করেন, বিএসসি প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা যে তিন দফা দাবি উত্থাপন করেছেন তা ভিত্তিহীন এবং অযৌক্তিক। বক্তারা বলেন, এসব দাবি বাস্তবায়ন হলে জাতীয় কর্মক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি হবে এবং শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাবে।
ডিপ্লোমা প্রকৌশলী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি মান্য করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে তারা আজ সকাল ১০টা থেকে মহাসড়ক ও রেলপথে অবরোধ রাখার ঘোষণা দেন। ফাউন্ডেশনের নেতারা বলেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রবর্তিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী উপসহকারী প্রকৌশলী ও সমমান পদে শুধুমাত্র ডিপ্লোমা প্রকৌশলী নিয়োগ করা উচিত। তারা অভিযোগ করেন, ১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়ার জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অমান্য করে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের উপসহকারী প্রকৌশলী (দশম গ্রেড) পদের পরিবর্তে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিম্নপদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা বন্ধ করতে হবে।
বক্তারা আরও জানান, ডিপ্লোমা শিক্ষাক্রমের গুণগত মান রক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আনুপাতিক হার ১:১২ করতে শিক্ষকস্বল্পতা দূরীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ কর্তৃক উত্থাপিত কারিগরি শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তারা দাবি করেন, শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলী অধিকার রক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
অবরোধকৃত এলাকায় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে নীরব আন্দোলন চালাচ্ছেন। তারা জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের উদ্দেশ্যে তাদের দাবি ও সমস্যা তুলে ধরেন। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, নেসকোসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের অধিকার ও দাবির প্রতি উদাসীন। আন্দোলনের এই তীব্র রূপের মাধ্যমে তারা পুনরায় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছেন।
স্থানীয় ট্রাফিক ও রেল কর্তৃপক্ষ বলছেন, অবরোধের কারণে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তবে তারা বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করার জন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংলাপের চেষ্টা করছেন। পুলিশ ও রেল স্টাফরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন।
ডিপ্লোমা প্রকৌশলী আন্দোলন বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সমস্যা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন। দেশে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ পলিটেকনিক শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাগ্রহণ করছেন। শিক্ষার্থীদের দাবি হলো, পেশাগত মর্যাদা, মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রকৌশলী অধিকার নিশ্চিত করা।
সাবেক ও বর্তমান শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এই ধরনের আন্দোলন থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীর অধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি শিক্ষার্থীদের দাবিকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন শুধু গাজীপুর বা নেসকোর সমস্যা নয়; এটি পুরো দেশের কারিগরি শিক্ষার অবস্থা ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি সংকেত। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে দাবি করা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও মূল্যবান শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিক্ষোভ ও অবরোধের প্রেক্ষাপটে গাজীপুরের রেলওয়ে স্টেশন ও মহাসড়কে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ট্রেন চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করতে সরকারি কর্মকর্তারা মীমাংসা ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছেন। তবে শিক্ষার্থীদের তীব্রতা ও দাবির স্পষ্টতা দেখা যাচ্ছে, যা সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
অবরোধ কার্যক্রমের সমাপ্তি হলেও শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের দাবির যথাযথ সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি গ্রহণ করা হতে পারে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যাতে তারা কারিগরি শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অধিকার সুরক্ষা এবং সরকারি নিয়োগ নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হন।
এভাবে গাজীপুরে মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি শুধু শিক্ষার্থীদের দাবি নয়, বরং বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাক্ষেত্রের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ইতিহাসে নথিভুক্ত হচ্ছে।