প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির জটিল বাস্তবতার মধ্যেই নতুন এক কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি আসন্ন চীন সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান যুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করবেন। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এই সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের চীনের সহায়তার প্রয়োজন নেই। তার ভাষায়, “আমরা যেকোনো উপায়ে জিতব, শান্তিপূর্ণভাবে হোক বা অন্যভাবে।”
মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসি থেকে চীনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। হোয়াইট হাউসের বাইরে দাঁড়িয়ে দেওয়া তার বক্তব্য মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করে। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই অর্থনীতির নেতা ছয় মাসেরও বেশি সময় পর সরাসরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই সফর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়; বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বিরোধ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, তাইওয়ান প্রশ্ন, দক্ষিণ চীন সাগর পরিস্থিতি এবং ইরান ইস্যু—সবকিছু মিলিয়ে এই বৈঠকের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের বিশেষ নজর রয়েছে।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে তার এবং শি জিনপিংয়ের মধ্যে “দীর্ঘ আলোচনা” হবে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের আলাদা কোনো সহায়তার প্রয়োজন নেই। তার দাবি, বর্তমানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন হলে নিজস্ব উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম।
ট্রাম্পের বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের সুর থাকলেও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল মনে করছে, বাস্তবে ইরান ইস্যুতে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীন বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে বড় জ্বালানি অংশীদার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই চীনে যায়। ফলে তেহরানের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বেইজিংয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতার কারণেই ট্রাম্পের সফরকে কেবল দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান নিয়েও এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্প তার বক্তব্যে শি জিনপিংকে ব্যক্তিগত বন্ধু হিসেবেও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমরা এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করব। সত্যি বলতে, আমার মনে হয় তিনি তুলনামূলকভাবে ভালোই। তারা ওই এলাকা থেকে তাদের তেলের বড় অংশ পায়। এছাড়া তিনি আমার বন্ধু।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রায়ই ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব দিয়ে থাকেন এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ককে তিনি আলোচনার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে, তাতে এই ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব কূটনৈতিক বাস্তবতায় কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য শুল্ক, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক বেশ চাপের মুখে পড়ে। তার মধ্যেই ইরান ইস্যু নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বেইজিংয়ের দ্বন্দ্ব এখন আরও স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। কিন্তু চীন প্রকাশ্যে সেই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি মানতে আগ্রহ দেখায়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি ইরানের তেল বাণিজ্যে সহযোগিতার অভিযোগে পাঁচটি চীনা তেল শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বেইজিং সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যত অগ্রাহ্য করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধান এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও তা স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনা বারবার অচলাবস্থায় পড়ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতিও পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। ফলে যেকোনো সময় নতুন উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্যে একদিকে যেমন শক্ত অবস্থানের বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি চীনের গুরুত্বও পরোক্ষভাবে স্বীকার করা হয়েছে। কারণ তিনি প্রকাশ্যে সহায়তার প্রয়োজন নেই বললেও ইরান প্রসঙ্গে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করার বিষয়টি নিজেই প্রমাণ করে যে বেইজিংকে পাশ কাটিয়ে এই সংকটের পূর্ণ সমাধান সহজ নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাজারের স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে ইরানকে ঘিরে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় ট্রাম্প-শি বৈঠক তাই শুধু দুই নেতার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ নয়; বরং এটি হতে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্ত। এখন দেখার বিষয়, ইরান ইস্যুতে দুই নেতা কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন এবং সেই আলোচনার প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কতটা বিস্তৃত হয়।