একশ দিন, ছত্রিশটি লাশ: বিএনপির অশুভ অভিযাত্রার রক্তাক্ত পাতা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬
  • ৫৮ বার

মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক | সম্পাদক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন | তারিখ: ২৮শে মে ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সন্ত্রাস, হত্যা ও নৈরাজ্যের যে কুৎসিত অধ্যায় বারবার ফিরে আসে, তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে গত একশ দিনে। সরকার গঠনের মাত্র একশ দিন পার হতে না হতেই বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর হাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ছত্রিশজন নিহত হয়েছেন। আমরা এই সম্পাদকীয়তে সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি বিস্তারিত ও নথিভুক্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করছি, যেন দেশবাসী জানে কোন দলটি ক্ষমতায় গিয়েও সন্ত্রাসের রাজনীতি ত্যাগ করতে পারেনি, বরং তা আরও সংগঠিত রূপ ধারণ করেছে।

আমরা যখন এই প্রতিবেদন তৈরি করছি, তখন ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সংঘটিত ছত্রিশটি হত্যাকাণ্ডের বিবরণ আমাদের সামনে। এসব ঘটনার পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও কৃষক দলের সক্রিয় নেতাকর্মীরা। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি রাজনৈতিক দল কেন ক্ষমতায় থাকার পরেও তার বিরোধীদের নয়, বরং নিজেদের দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেই হিংস্র সংঘর্ষে লিপ্ত হয়? কেন একশ দিনে ছত্রিশটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটল, যার মধ্যে অধিকাংশই দলীয় আধিপত্য, চাঁদাবাজি, জমিজমা ও জলাশয় দখল, এমনকি মাংসের চারশ টাকার বকেয়া পাওনার মতো তুচ্ছ ঘটনা ঘিরে? এটা কোনো রাজনৈতিক আদর্শের লড়াই নয়; এটি একেবারে অপরাধী চক্রের লড়াই, যেখানে দলীয় পতাকা কেবল ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফেব্রুয়ারি মাসেই ঘটে যায় ছয়টি হত্যাকাণ্ড। যশোরের শার্শায় পল্লী চিকিৎসক আল আমিন তারাবির নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে কুপিত হন। তার অপরাধ কী ছিল? হয়তো কিছুই না। অথচ যুবদলের তিন কর্মীকে পুলিশ আটক করেছে। নরসিংদীর মাধবদীতে ভয়াবহ এক ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীকে তার বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করা হয় এবং এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে বিএনপি নেতাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এখানে ভুক্তভোগী কিশোরী ও তার বাবা নয়, খুনিরা ছিল বিএনপির সঙ্গে জড়িত। এরপর খুলনার দিঘলিয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা পায়ের রগ কেটে যুবদল নেতা খান মুরাদকে খুন করে। এ যেন দলীয় হত্যাকাণ্ডের এক শৃঙ্খল। রাজশাহীর চারঘাটে বিএনপি নেতা এরশাদ আলীকে পিটিয়ে হত্যা করে দলের আরেক পক্ষের নেতাকর্মীরা। সিলেটের বালাগঞ্জে মোবাইল ফোন হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি কর্মী শাহ ইসমাইল আলী ছুরিকাঘাতে নিহত হন। আর রাজশাহীতে দিনমজুর গোলাম মোস্তফা গুলিতে নিহত হওয়ার মামলায় র্যাব বিএনপির এক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। ফেব্রুয়ারির এই ছয়টি ঘটনাই প্রমাণ করে যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্যের লড়াই ও অপরাধী মানসিকতা কতটা গভীরে প্রোথিত।

মার্চ মাস পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এই মাসেই নিহত হন কুড়ি জন। প্রথম দিনেই চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে জামায়াত কর্মী হাফিজুর রহমান নিহত হন। এর তিন দিন পর পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ফেসবুকে পোস্ট করাকে কেন্দ্র করে যুবদল নেতা জহিরুল ইসলাম এক ব্যক্তিকে মারধর করে হত্যা করেন। এ যেন মৌলিক অধিকার খর্ব করার এক জঘন্য উদাহরণ, যেখানে মতপ্রকাশের বিনিময়ে প্রাণ দিতে হয়। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে সরকারি জলাশয়ের ইজারা নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুই কর্মী আব্দুস সালাম ও ইসমাইল হোসেন নিহত হন। জলাশয় ইজারা নিয়ে রাজনৈতিক দলের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ? দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের এ যেন এক সুস্পষ্ট রূপ। রাজশাহীর মোহনপুরে ঈদের নামাজ পড়ানোর ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে জামায়াত কর্মী আলাউদ্দিন নিহত হন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ইমাম নিয়োগের বিষয়টি যখন হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে হবে সংঘাতের বীজ কত গভীরে পোঁতা হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে বিএনপির হামলায় আহত জামায়াত নেতা হাফিজুর রহমান কিছুদিন পর মারা যান। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে যুবদল কর্মী সজিব চৌধুরী আকাশ নিহত হন। ফেনীর ছাগলনাইয়ায় একই চিত্র: বিএনপির দু’পক্ষের সংঘর্ষে যুবদল কর্মী আবু আহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেন। খুলনার রূপসায় ঘটে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা। মাত্র চারশ টাকা মাংসের বকেয়া পাওনাকে কেন্দ্র করে কৃষকদল নেতা আবুল খায়েরের হামলায় দ্বীন মোহাম্মদ ঢালী নামের এক চা-বিক্রেতার মৃত্যু হয়। চারশ টাকার জন্য একটি জীবন! চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় ঈদের দিনে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নাজিম কাজি ও শিমুল কাজি নামে দুইজনের মৃত্যু হয়। ঈদের আনন্দ রক্তপাতে পর্যবসিত হয়।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে সোহেল রানার গলা কেটে হত্যার ঘটনায় বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা হয়। বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে সালিশ বৈঠক চলাকালে বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর হাওলাদারের হামলায় ট্যানারি শ্রমিক খোরশেদ সিকদার নিহত হন। সালিশ বৈঠক? নাকি খুনের আয়োজন? পাবনার সুজানগরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও গুলিতে গৃহবধূ চায়না খাতুন নিহত হন। একজন নারী, যার সম্ভবত রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না, তিনি শুধু ভুল স্থানে ভুল সময়ে উপস্থিত ছিলেন বলেই প্রাণ হারান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বিএনপির এমপি ও পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে মসজিদের ইমামসহ দুইজন নিহত হন। মসজিদের ইমাম, যিনি শান্তির বাণী প্রচার করেন, তিনিও রক্ষা পাননি সন্ত্রাসের থাবা থেকে। পাবনার সুজানগরে আহত মুনছুর খাঁ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে আহত মাফাজুল মিয়া পরবর্তীতে মারা যান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মাদক সেবন, মাদকের ব্যবসা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিও তৈরি করায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর দ্বীন ইসলামকে হত্যা করা হয় এবং এ হত্যার নেতৃত্ব দেন বিএনপি নেতা আবদুল আওয়াল জাহাঙ্গীর আলম। সাংবাদিকতার নামে নয়, নাগরিক সচেতনতার ভিডিও বানিয়েছিলেন বলেই প্রাণ দিতে হলো একজন তরুণকে। আর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে বাকপ্রতিবন্ধী আলম মিয়াকে পিটিয়ে হত্যার দায়ে ছাত্রদল নেতাসহ তিনজন গ্রেপ্তার হন। যার কথা বলার ক্ষমতা নেই, তাকে পিটিয়ে হত্যা? কীরকম বর্বরতা!

এপ্রিল মাসে আরও সাতজনের প্রাণ যায়। বগুড়া শহরের ব্যস্ততম বাজার থেকে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় ব্যবসায়ী সমিতির নেতা আলাল শেখকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আলাল শেখের মৃত্যু হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে একজন নেতাকে অপহরণ করে নির্যাতন? দেশে আইনের শাসন নেই? নোয়াখালী সদরে চাঁদা না দেওয়ায় যুবদল নেতা লিটন চৌধুরীর হামলায় আহত বৃদ্ধ আবদুল হাই মারা যান। একাত্তরের ঘাতকরা বৃদ্ধ-নারী-শিশু বেছে নিত না, আজকের এই সন্ত্রাসীরাও তাই করে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় আসাদুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত সাবেক যুবদল নেতা আক্তার ও মুন্নাসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের হামলায় আহত ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আহমেদ হৃদয় মারা যান। ঝিনাইদহের শৈলকুপায় বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মোহন শেখ এবং খুলনার তেরখাদায় বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নুর আলম ও মো. হিজমুল্লাহ সোহেল রানা নিহত হন।

মে মাসের প্রথম পঁচিশ দিনেই তিনজন নিহত হয়েছেন, যা এই হত্যাকাণ্ডের ধারা অব্যাহত রাখে। বরিশালের বাকেরগঞ্জে চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে হামলায় হালিম হাওলাদার নিহত হন। কক্সবাজারের উখিয়ায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের হামলায় ছৈয়দা বেগম নামে এক নারী নিহত হন। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জমির মাটি কাটা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে বিএনপি নেতা ওসমান গণি কুপিত হয়ে মারা যান।

এই ছত্রিশটি হত্যাকাণ্ডের প্রতিটির পেছনে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রশাসনের কাছে প্রমাণিত হয়েছে। পুলিশ ও র্যাব অনেক ক্ষেত্রেই আসামি গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো: একটি রাজনৈতিক দল কেন বারবার সন্ত্রাসের রাজনীতিতে ফিরে যায়? তাদের নেতাকর্মীরা কেন প্রকাশ্য দিনের আলোয় মানুষ খুন করে, অথচ দলীয় উচ্চকমান্ড থেকে আসে না কোনো প্রতিবাদ, কোনো নিন্দা? বরং দেখা যায়, যারা এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত, তারা দলীয় বিভিন্ন পদে আসীন অথবা দল তাদের পক্ষে ওকালতি করে।

দেশবাসী স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, বিএনপি কখনো সন্ত্রাসের রাজনীতি ছাড়েনি। ক্ষমতায় গিয়েও তারা পুরোনো অভ্যাস বদলাতে পারেনি। বরং এ একশ দিনে প্রমাণিত হয়েছে যে, তাদের ভেতরের দ্বন্দ্ব, দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের রাজনীতি হত্যার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। একদিকে তারা সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলে, অন্যদিকে নিজেদের অনিয়ন্ত্রিত নেতাকর্মীরা দেশের সর্বত্র খুন-সংঘর্ষ চালিয়ে যাচ্ছে।

আমরা এই সম্পাদকীয়তে কোনো বুলেট পয়েন্ট ব্যবহার করিনি, কারণ হত্যাকাণ্ডের তালিকা পয়েন্ট আকারে উপস্থাপন করলে হয়তো পাঠক তা ক্ষণস্থায়ী মনে করতে পারেন। কিন্তু প্রতিটি নাম, প্রতিটি তারিখ, প্রতিটি ঘটনার পেছনে আছে একেকটি পরিবারের বিনাশ, একেকটি স্বপ্নের মৃত্যু। পল্লী চিকিৎসক আল আমিন, দিনমজুর গোলাম মোস্তফা, বাকপ্রতিবন্ধী আলম মিয়া, চা-বিক্রেতা দ্বীন মোহাম্মদ ঢালী, বৃদ্ধ আবদুল হাই, গৃহবধূ চায়না খাতুন—এরা কেউ রাজনীতির ময়দানের যোদ্ধা নন। তারা সাধারণ মানুষ। তাদের মৃত্যু প্রমাণ করে, এই সন্ত্রাসের রাজনীতি শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীকেই নয়, বরং সাধারণ নাগরিককেও গ্রাস করছে।

আমরা রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংবিধান ও আইনশাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞ মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গতভাবে হোক। খুনিরা যেই দলেই থাকুক, আইনের আওতায় আনা হোক। সাধারণ মানুষ নিরাপদে বাঁচার অধিকার রাখে। কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থের জন্য আর কোনো নির্দোষের রক্ত ঝরানো যাবে না।

একইসঙ্গে আমরা বিএনপির উচ্চকমান্ডের কাছেও জানতে চাই, তাদের নীরবতার অর্থ কী? এই ছত্রিশটি হত্যাকাণ্ডের কোনো জবাবদিহি তাদের নেই? তারা কি মনে করে, এভাবে সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশ শাসন করা যায়? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়, তাদের পতন অনিবার্য। ক্ষমতার একশ দিনে তারা যে ভয়াবহ রক্তপাত ঘটিয়েছে, তার দায় তাদের নেতৃত্বকেই বহন করতে হবে।

আমরা শেষ করছি এই প্রত্যাশায় যে, দেশের জনগণ আর বিভ্রান্ত হবে না। তারা দেখবে কার হাতে সন্ত্রাস আর কার হাতে উন্নয়ন। একশ দিনে ছত্রিশটি হত্যাকাণ্ড একটি রাজনৈতিক দলের আসল চেহারা জনগণের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত জনগণের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত