প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে পাঁচ দিনের সরকারি সফরে তুরস্কের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। রোববার (১৯ জুলাই) সকালে তিনি সরকারি সফরে রওনা হন। এই সফরকে দুই দেশের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও কার্যকর, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ভবিষ্যতমুখী পর্যায়ে উন্নীত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, তুরস্ক সরকারের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে সেনাবাহিনী প্রধান এ সফরে অংশ নিচ্ছেন। সফরকালে তিনি দেশটির বিভিন্ন প্রতিরক্ষা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের পাশাপাশি তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং প্রতিরক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করবেন। সফর শেষে আগামী সপ্তাহে তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, সামরিক সরঞ্জাম, যৌথ অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেনাপ্রধানের এই সফর সেই সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্পসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পরিচিত। দেশটি নিজস্ব প্রযুক্তিতে যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি, সামরিক রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ধরনের মানববিহীন আকাশযান বা ড্রোন তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারেও তুরস্কের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের তৈরি সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম রপ্তানি হচ্ছে, যা দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বাংলাদেশও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে কাজ করছে। এ কারণে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করা বাংলাদেশের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে তুরস্কের বিভিন্ন প্রতিরক্ষা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন। এসব প্রতিষ্ঠানে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, গবেষণা, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা নেবেন সেনাপ্রধান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সফর শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের সুযোগই তৈরি করে না, বরং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য যৌথ উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ সহযোগিতা কিংবা প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সফর চলাকালে তুরস্কের সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সামরিক প্রশিক্ষণ, পারস্পরিক সহযোগিতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা খাতের বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের বিস্তারিত এজেন্ডা প্রকাশ করা হয়নি, তবে প্রতিরক্ষা কূটনীতির ধারাবাহিকতায় এসব বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সব সময়ই বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করছে। তুরস্কের সঙ্গে বিদ্যমান সুসম্পর্ক সেই নীতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দুই দেশের সম্পর্ক শুধু প্রতিরক্ষা খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামেও বাংলাদেশ ও তুরস্ক ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চপর্যায়ের সফর এবং সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে সেনাপ্রধানের এই সফরকে বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয় নয়। আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্য আদান-প্রদান, সাইবার নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের গুরুত্ব বেড়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম শীর্ষ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়ন দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সেনাপ্রধানের সফরের সময় তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের অগ্রগতি এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আধুনিক সামরিক ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পর্কে এ ধরনের সফর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা প্রণয়নেও সহায়ক হতে পারে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং উচ্চপর্যায়ের সফর পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে যৌথ প্রশিক্ষণ, সামরিক শিক্ষা, প্রতিরক্ষা গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও এ ধরনের যোগাযোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বর্তমানে আধুনিকায়ন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সেই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, সামরিক শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
তুরস্ক সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। সফরে অনুষ্ঠিত বৈঠক, প্রতিরক্ষা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং পারস্পরিক মতবিনিময় ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এই সফর বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতিকে আরও সক্রিয় ও বহুমাত্রিক করার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইএসপিআর জানিয়েছে, সফর শেষে আগামী সপ্তাহে সেনাবাহিনী প্রধান দেশে ফিরবেন। সফরের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং অর্জন সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হতে পারে।