সর্বশেষ :

জনআস্থাই আধুনিক পুলিশিংয়ের সফলতা: আইজিপি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার

বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, আধুনিক যুগে পুলিশের সফলতা কেবল অপরাধী গ্রেপ্তার কিংবা অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত অর্থে একটি আধুনিক, গণমুখী ও কার্যকর পুলিশ বাহিনীর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো জনগণের আস্থা অর্জন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সুরক্ষা, পেশাগত সততা বজায় রাখা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের জন্য মানসম্মত ও মানবিক সেবা প্রদান। তিনি বলেন, জনগণের বিশ্বাস ছাড়া কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।

শনিবার (১৮ জুলাই) রাজধানীতে পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত মাস্টার অব অ্যাপ্লায়েড ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ ম্যানেজমেন্ট (এমএসিপিএম) মাস্টার্স প্রোগ্রামের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ১০ম ব্যাচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, পুলিশ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

আইজিপি বলেন, বিশ্বব্যাপী অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন নতুন ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। সাইবার অপরাধ, সংগঠিত অপরাধ, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, অর্থপাচার, আর্থিক জালিয়াতি, পরিবেশগত অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যদের আরও দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জ্ঞানসমৃদ্ধ হয়ে উঠতে হবে।

তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুলিশিং ব্যবস্থাকেও পরিবর্তিত হতে হবে। শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে দায়িত্ব পালন করলে চলবে না। আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, গবেষণালব্ধ জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয়ে কার্যকর পুলিশিং নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় অপরাধ দমনের পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আইজিপি আরও বলেন, একজন আধুনিক পুলিশ কর্মকর্তাকে শুধু আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক, নৈতিক নেতৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি, কৌশলগত চিন্তাবিদ এবং আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণা, জ্ঞানচর্চা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কোনো বিকল্প নেই।

তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, উচ্চশিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের জন্য নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা। গবেষণা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে নীতিনির্ধারণ এবং কার্যকর পুলিশ ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশের রেক্টর কাজী মো. ফজলুল করিম। তিনি তাঁর বক্তব্যে আইজিপির উপস্থিতি এবং দিকনির্দেশনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ স্টাফ কলেজ দেশের পুলিশ সদস্যদের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ নেতৃত্ব তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

স্বাগত বক্তব্য দেন পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশের পরিচালক (অ্যাকাডেমিক) সরকার ওমর ফারুক। তিনি এমএসিপিএম প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য, পাঠ্যক্রম এবং এর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, আধুনিক পুলিশিংয়ের জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কর্মসূচির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা অপরাধতত্ত্ব, পুলিশ ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব, নীতি প্রণয়ন, গবেষণা পদ্ধতি এবং সমসাময়িক নিরাপত্তা বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন।

পুলিশ স্টাফ কলেজের তথ্য অনুযায়ী, মাস্টার অব অ্যাপ্লায়েড ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ ম্যানেজমেন্ট (এমএসিপিএম) একটি এক বছর মেয়াদি মাস্টার্স প্রোগ্রাম, যেখানে দুটি সেমিস্টারের মাধ্যমে পাঠদান সম্পন্ন হয়। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ১০ম ব্যাচে মোট ৫০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছেন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, চিকিৎসক, বিচার বিভাগের কর্মকর্তা, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পেশাজীবীরা রয়েছেন। বহুমাত্রিক এই অংশগ্রহণ শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্রকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করা সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্তের মানোন্নয়ন এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় সহায়তা আরও কার্যকর হয়। একই সঙ্গে মানবাধিকার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতাভিত্তিক পুলিশিং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য অংশ।

তাঁরা আরও মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তার এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। এ ধরনের মাস্টার্স প্রোগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করে না, বরং পুরো পুলিশ বাহিনীর নীতিগত ও পেশাগত সক্ষমতা উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এমএসিপিএম প্রোগ্রামের নতুন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা অর্জিত জ্ঞান ও গবেষণার ফল বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করে আধুনিক, মানবিক এবং জনগণকেন্দ্রিক পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অবদান রাখবেন। একই সঙ্গে পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং পেশাগত নেতৃত্ব বিকাশের ধারাবাহিকতায় এই নতুন ব্যাচ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলেও তাঁরা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত