সৌদি প্রতিরক্ষা জোটে যোগদান ইরানবিরোধী নয়: হুমায়ুন কবির

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগদানকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন আলোচনা চললেও সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই ইরানবিরোধী অবস্থান নয়। বরং এটি সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর একটি অংশ। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, জোটে যোগদানের মূল উদ্দেশ্য ইয়েমেনভিত্তিক হুতি বিদ্রোহীদের সৃষ্ট নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় সহযোগিতা করা, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া নয়।

রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্য, পারস্পরিক সম্মান এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা জোটে অংশগ্রহণকে ইরানকে লক্ষ্য করে নেওয়া কোনো পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুদিনের এবং বহুমাত্রিক। এতদিন এই সম্পর্ককে অনেকেই হজ, ওমরাহ এবং ধর্মীয় যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখেছেন। তবে বর্তমান সরকার দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং নিরাপত্তাভিত্তিক অংশীদারিত্বে রূপ দিতে চায়। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, মুসলিম বিশ্বের দুটি পবিত্র মসজিদ—মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর রক্ষক হিসেবে সৌদি আরবের একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক শুধু রাষ্ট্রীয় নয়, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় আবেগের সঙ্গেও যুক্ত। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সময়ে ঢাকা-রিয়াদ সম্পর্ককে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। এই সম্পর্ক এখন অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছে।

হুমায়ুন কবিরের মতে, যদি সৌদি আরব তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা চায়, তাহলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সেই আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দিতে প্রস্তুত থাকবে। তবে তিনি এও স্পষ্ট করেন যে, এই সহযোগিতা আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের আলোকে পরিচালিত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। লোহিত সাগর ও আশপাশের সামুদ্রিক অঞ্চলে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলেছে। ফলে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন সহযোগিতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করছে। বাংলাদেশের অংশগ্রহণকেও সেই বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল বিশেষ দূত সার্জিও গরের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর ছিল মূলত পরিচিতিমূলক এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্যে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

তিনি জানান, সফরকালে সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মতবিনিময় হয়। উভয় পক্ষই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, সফর শেষে মার্কিন বিশেষ দূত প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এই বক্তব্য দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও সম্পর্কের ইতিবাচক দিককে প্রতিফলিত করে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

চীনা বিনিয়োগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, সাম্প্রতিক বৈঠকে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি বা উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে কোনো একটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে গিয়ে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না।

তাঁর মতে, বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ যেমন রয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ এবং অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের বিনিয়োগও রয়েছে। সরকার সব দেশের জন্য সমানভাবে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে আগ্রহী এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরে রাখতে চায়।

পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমবাজার, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। ফলে কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই একই নীতি অনুসরণের চেষ্টা করছে ঢাকা।

পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সৌদি নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চললেও সরকারের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, ঢাকা এই সিদ্ধান্তকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবেই দেখছে। একই সঙ্গে ইরান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার নীতিই অনুসরণ করতে চায় বাংলাদেশ।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত