এআই মনিটরিংয়ে পোশাক উৎপাদনশীলতা বাড়ছে ২৫ শতাংশ

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। কারখানার উৎপাদন লাইনে মেশিন ও শ্রমিকের কাজ রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি ত্রুটি ও অকার্যকর সময় কমানোর চেষ্টা করছেন উদ্যোক্তারা।

শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র ও কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেশ কয়েকটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় ইতোমধ্যে আইওটি-ভিত্তিক উৎপাদন মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। কিছু কারখানায় উৎপাদন লাইনের নির্দিষ্ট অংশে এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রায় প্রতিটি সেলাই মেশিনে এ প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হয়েছে। ব্যবহৃত কারখানাগুলোর কয়েকটি উৎপাদনশীলতা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার কথা জানিয়েছে।

ধামরাইয়ের স্নোটেক্স গ্রুপ, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা অ্যাপারেলস, সাভারের টিম গ্রুপ, আদমজী ইপিজেডের ইউনেস্কো গ্রুপের একটি কারখানা এবং ময়মনসিংহের ভালুকার স্প্যারো গ্রুপের কারখানায় এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া হা-মীম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, উর্মি গ্রুপ ও ফকির ফ্যাশন্সের মতো বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানও ডিজিটাল উৎপাদন মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ফতুল্লা অ্যাপারেলস ২০২০ সালের শেষ দিকে উৎপাদন পর্যায়ে আইওটি-ভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করে। এরপর ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য রপ্তানিমুখী কারখানাতেও এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে থাকে।

স্নোটেক্সে বড় পরিসরে প্রযুক্তির ব্যবহার

যোগাযোগ করা কারখানাগুলোর মধ্যে স্নোটেক্স গ্রুপ বড় পরিসরে আইওটি প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সাল থেকে তাদের সব কারখানার প্রায় ১০ হাজার সেলাই মেশিনে আইওটি ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে।

ধামরাইয়ে স্নোটেক্সের একটি কারখানার উৎপাদন ফ্লোরে প্রতিটি সেলাই মেশিনের সঙ্গে এমন ডিভাইস সংযুক্ত রয়েছে। এসব ডিভাইসের মাধ্যমে মেশিনের কার্যক্ষমতা, উৎপাদনের পরিমাণ এবং ত্রুটির মতো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় পাওয়া যায়।

স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম খালেদ বলেন, প্রযুক্তিটি চালুর পর ম্যানুয়াল পদ্ধতির তুলনায় উৎপাদনশীলতা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, মেশিন বা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হওয়ায় অকার্যকর সময় কমেছে।

এই ব্যবস্থায় কারখানার ব্যবস্থাপকরা প্রতিটি মেশিন ও অপারেটরের উৎপাদন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কোনো মেশিনের গতি কমে গেলে কিংবা ত্রুটি দেখা দিলে কেন্দ্রীয় মনিটরিং স্ক্রিনে তাৎক্ষণিকভাবে সংকেত পাওয়া যায়। ফলে লাইন চিফ বা প্রোডাকশন ম্যানেজার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

এ ছাড়া কোনো সমস্যা মেশিনের ত্রুটির কারণে নাকি অপারেটরের ভুলের কারণে হচ্ছে, সেটিও তুলনামূলক সহজে শনাক্ত করা যায়। এতে সমস্যা সমাধানে সময় কমার পাশাপাশি উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়ও কমানো সম্ভব হচ্ছে।

স্প্যারো গ্রুপে উৎপাদন বেড়েছে ৫-১০ শতাংশ

স্প্যারো গ্রুপ প্রায় ছয় মাস আগে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে। বছরে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, তাঁদের মোট সেলাই মেশিনের প্রায় অর্ধেকে আইওটি ডিভাইস স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে সব সেলাই মেশিনে এ ডিভাইস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

শোভন ইসলামের মতে, উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি পোশাকের গুণগত মান পর্যবেক্ষণেও এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

যেভাবে কাজ করে আইওটি মনিটরিং

আইওটি-ভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রতিটি সেলাই মেশিনের সঙ্গে একটি ডিভাইস সংযুক্ত করা হয়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের নাম ও পরিচিতি যুক্ত থাকে। উৎপাদন ফ্লোরের সব ডিভাইস একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার বা ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।

এর ফলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ একটি নির্দিষ্ট ফ্লোরের পাশাপাশি একাধিক কারখানার উৎপাদন পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করতে পারে। কোনো সমস্যার সমাধান হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সেটি সিস্টেমে নথিভুক্ত করেন। এতে সমস্যা সমাধানে কে দায়িত্ব নিয়েছেন এবং কত সময় লেগেছে, সেই তথ্যও সংরক্ষিত থাকে।

কারখানাভেদে ব্যবহৃত ডিভাইস ও সফটওয়্যারে পার্থক্য থাকলেও মূল উদ্দেশ্য একই—উৎপাদন প্রক্রিয়ার তথ্য দ্রুত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা।

একটি কারখানার একজন আইটি বিশেষজ্ঞ জানান, আগে উৎপাদন ফ্লোরে কোনো সমস্যা হলে সেটি শনাক্ত ও সমাধান করতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগত। এখন ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্যার অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

শ্রমিকদের জন্য উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা

ডিজিটাল মনিটরিংয়ের পাশাপাশি কিছু কারখানায় শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ও প্রণোদনা ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। মেশিন অপারেটরদের প্রতি ঘণ্টায় নির্দিষ্ট পরিমাণ উৎপাদনের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য পূরণ বা অতিরিক্ত উৎপাদনের ক্ষেত্রে বোনাস দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি পণ্যে ত্রুটির হার বিবেচনা করে প্রণোদনার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। স্নোটেক্সের শ্রমিক আফিজুল জানান, উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা চালুর পর স্বাভাবিক বেতনের বাইরে মাসে গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আরেক অপারেটর শারমিন আক্তার জানান, নতুন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার কারণে মাসে প্রায় ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত বোনাস পাচ্ছেন তিনি। ওভারটাইমসহ অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে কোনো কোনো মাসে তাঁর আয় ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে।

তবে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে শ্রমিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।

শ্রমিক নেতাদের উদ্বেগ

আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাজমা আক্তার বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও এর মাধ্যমে শ্রমিকদের কাছ থেকে তাঁদের শারীরিক সক্ষমতার তুলনায় বেশি কাজ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তাঁর মতে, বাড়তি কাজের চাপের তুলনায় শ্রমিকদের দেওয়া প্রণোদনা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়।

কিছু শ্রমিকও জানিয়েছেন, প্রযুক্তি চালুর পর তাঁদের ঘণ্টাপ্রতি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে। তবে বাড়তি উৎপাদনের বিনিময়ে অতিরিক্ত আয় হওয়ায় অনেকে বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছেন।

স্নোটেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম খালেদ অবশ্য শ্রমিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির অভিযোগ নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো মেশিনের ত্রুটি ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার অকার্যকর সময় দ্রুত শনাক্ত করে সমাধান করা।

টিম গ্রুপের একজন জ্যেষ্ঠ আইটি কর্মকর্তাও বলেন, শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা নয়, বরং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অপচয় ও অকার্যকর সময় কমানোর জন্যই এই ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় প্রযুক্তির বিকল্প নেই

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শ্রমের তুলনামূলক সুবিধার ওপর দীর্ঘদিন নির্ভর করা এই শিল্পকে চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো উৎপাদনশীল প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পোশাকশিল্পে ডিজিটালাইজেশনের বিকল্প নেই।

তিনি জানান, বাংলাদেশের শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে, যেখানে চীন ও ভিয়েতনামে তা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। এই ব্যবধান কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, ন্যায্য প্রণোদনা এবং কর্মপরিবেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করার সঙ্গেও সমন্বয় করা প্রয়োজন। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রমিকের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত