প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং জনভোগান্তি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎের তথাকথিত ‘ভুতুড়ে বিল’ বা ব্যবহার না করেও অতিরিক্ত বিল আসার অভিযোগকে সামনে এনে সরকারের সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও অনেক গ্রাহকের নামে অস্বাভাবিক বিল আসছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর তদন্ত কিংবা পুনর্যাচাইয়ের উদ্যোগ নিচ্ছে না। একই সঙ্গে গ্যাস–সংকট, লোডশেডিং এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের দুর্বল ব্যবস্থাপনা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি।
সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিদ্যুৎের ভুতুড়ে বিল নিয়ে দেশজুড়ে অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরকার তদন্ত ও পুনর্যাচাইয়ের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত অনিয়ম কেবল একটি প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, এটি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, সীমিত আয়ের পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করছে। এর মধ্যে যদি প্রকৃত ব্যবহারের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়, তাহলে তা তাদের জন্য বাড়তি আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরকারের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, সরকার বর্তমানে সংবিধান, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং বিভিন্ন নীতিগত বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও জনগণের নিত্যদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিচ্ছে না। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংকট এবং জনদুর্ভোগের মতো বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না বলেও তিনি দাবি করেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে ২১৫ কোটি ঘনফুটেরও নিচে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তার দাবি, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আমদানিকৃত গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। পাশাপাশি বিদেশি এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে জ্বালানি ব্যয়ও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে আসছে। অথচ নতুন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র অনুসন্ধানে কার্যকর বিনিয়োগ বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। তার মতে, আগের সরকার দীর্ঘ সময় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি এবং বর্তমান সরকারও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো বড় উদ্যোগ নিতে পারেনি। এর প্রভাব পড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, যেখানে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহারে মানুষের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গ্যাস–সংকটের প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ছে এবং শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরে জামায়াত। দলটির পক্ষ থেকে প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ, দুর্নীতি রোধ, বিদ্যুৎ সরবরাহে নিরবচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি খাতে বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাস পরও জনগণের মধ্যে প্রত্যাশিত স্বস্তি ফিরে আসেনি। তার দাবি, বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরকারের প্রতিনিধিদের জনগণের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং জুলাই-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন অনেকে।
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, তাদের কাছে শত শত গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিলের কপি রয়েছে, যেখানে অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি দাবি করেন, সংসদে সার্ভিস চার্জ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি প্রিপেইড মিটারে ডিমান্ড চার্জ কাটা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাজিবুর রহমান মোমেনের দাবি, অর্থবছরের শেষ মাস জুনে অনেক সময় সিস্টেম লস কম দেখানোর উদ্দেশ্যে অনুমাননির্ভর কম বিল করা হয়। পরে জুলাই মাসে প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের ভিত্তিতে একসঙ্গে বেশি বিল আসায় গ্রাহকরা অস্বাভাবিক আর্থিক চাপের মুখে পড়েন। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির প্রকৃত কারণ ও ব্যয়ের হিসাব জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
তিনি মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়েও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে শিল্পখাতে জ্বালানি সরবরাহে কোনো ধরনের পরিকল্পনাগত ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
দেশের জ্বালানি খাত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণও সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান গ্যাস–সংকট এবং এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব না দিলে এমন সংকট আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অতীতে বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, কোনো গ্রাহক অতিরিক্ত বা ভুল বিলের অভিযোগ করলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে তা যাচাই করা হয় এবং প্রয়োজন হলে সংশোধন করা হয়। তবে গ্রাহক অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের মতে, অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষকে বারবার অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে না হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎের ভুতুড়ে বিল, গ্যাস–সংকট, লোডশেডিং এবং শিল্প উৎপাদনে জ্বালানির ঘাটতি—সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি খাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা, শিল্পমালিকদের উদ্বেগ এবং সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগের মধ্যে সরকার কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান প্রত্যাশা।