প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তীব্র তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে, টাচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামক একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান পণ্য রপ্তানি না করেই প্রায় চার কোটি টাকা নগদ প্রণোদনা গ্রহণ করেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটি জাল দলিল তৈরি করে ভুয়া বিল অব এক্সপোর্ট জমা দিয়েছিল, যার মাধ্যমে সরকারি প্রণোদনা সুবিধা নিয়েছে। এই কাণ্ডে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে মামলা পরিচালনার পাশাপাশি প্রণোদনা বাতিল এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, টাচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেশ আলু রপ্তানি করার কথা উল্লেখ করে মোট ৬৮টি বিল অব এক্সপোর্ট (বিওই) দাখিল করেছিল। এর মধ্যে ২০২০ সালে ৬৬টি, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রতি বছর একটি করে বিল অব এক্সপোর্ট ছিল। তবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তদন্ত কমিটি এই ৬৮টির মধ্যে ৬৪টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে কোনো বাস্তব পণ্য রপ্তানির তথ্য পায়নি। এর মানে, বিলের তথ্য ও দলিলাদি ভুয়া ছিল এবং কোনো পণ্য আদৌ রপ্তানি হয়নি।
অদ্ভুতভাবে, এই জালিয়াতির মধ্য দিয়ে ৬২টি বিল অব এক্সপোর্টের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি রূপালী ব্যাংকের মতিঝিল করপোরেট শাখা থেকে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা নগদ প্রণোদনা পেয়েছে। অর্থাৎ, সরকারের নগদ প্রণোদনা নীতিমালা শোষণ করে পুরোপুরি অবৈধ উপায়ে অর্থ আদায় করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই অবৈধ নগদ প্রণোদনা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। কমিশনার শফিউদ্দিন গতকাল সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে টাচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রণোদনা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, পণ্য রপ্তানি না করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফিরিয়ে এনে কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককেও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
টাচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের অভিযোগের তদন্তে উঠে এসেছে, তারা ঢাকার কদমতলীর পূর্ব জুরাইনের অফিস থেকে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে ৬৮টি বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করেছিল। কিন্তু কাস্টমস কমিটির যাচাই-বাছাইয়ে জানা যায়, এসব বিলের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ডিপো থেকে পণ্য গ্রহণ বা রপ্তানির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এটি প্রমাণ করে যে, রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও শিপিং এজেন্ট বা ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং এজেন্টরা মিলে একটি যৌথ যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে মিথ্যা দলিল তৈরি করেছে।
সরকার বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে নগদ প্রণোদনা দেয়, যা বৈদেশিক মুদ্রা আহরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ৪৩টি পণ্যের রপ্তানিতে বিভিন্ন হারে নগদ প্রণোদনা প্রদান করা হয়, যা শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে এই রপ্তানিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পণ্য রপ্তানি না করেই সরকারি প্রণোদনা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা সরকারের স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি বিরোধী নীতির জন্য বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ।
এই ঘটনার মাধ্যমে কেবলমাত্র সরকারি অর্থ ক্ষতির মুখে পড়েনি, বরং দেশের রপ্তানি খাতের নৈতিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষুণ্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করছে এই দুর্নীতির মোকাবেলা এবং ভবিষ্যতে এমন অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে কিনা। প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে রপ্তানি খাতের স্বাভাবিক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এখন প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সুনাম রক্ষা ও সরকারের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে জোরদার নজরদারি, স্বচ্ছতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের সতর্কতা প্রয়োজন।